বিরল রত্ন ও কারুশিল্পে ভর করে বাড়ছে ‘হাই জুয়েলারি’ ব্যবসা

বৈশ্বিক বিলাসপণ্যের বাজারে ধীরগতির প্রবণতা দেখা গেলেও উচ্চমূল্যের বা ‘হাই জুয়েলারি’ খাত শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে।

শেয়ারবাজারের রেকর্ড উচ্চতা, স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি ও অনিশ্চিত সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগের প্রবণতা—এ তিন কারণে বিশ্বজুড়ে ধনীদের মধ্যে দামি গহনার চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও বিরল রত্নের আকর্ষণও বাজারটি এগিয়ে নিচ্ছে।

বৈশ্বিক বিলাসপণ্যের বাজার গত কয়েক বছর নানা ধরনের চাপে রয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভোক্তাদের ব্যয় করার ধরনে পরিবর্তনের কারণে অনেক বিলাসপণ্যের বিক্রি কমেছে। তবে এ পরিস্থিতির মধ্যেও উচ্চমূল্যের গহনার বাজার বা হাই জুয়েলারি খাত শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানায় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে রেকর্ড লেনদেন ও ধনী গ্রাহকদের সম্পদ বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিলাসবহুল গহনার বাজারে।

ব্রিটিশ ব্যাংক এইচএসবিসির ভোক্তা বিলাসপণ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান অ্যান-লর বিসমুথ বলেন, ‘বিলাসপণ্যের সামগ্রিক খাতের তুলনায় গহনার ব্যবসা এখন ভালো অবস্থানে আছে এবং ভবিষ্যতেও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।’

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিলাসপণ্য গ্রুপ রিশমোঁর সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনও এ প্রবণতার প্রমাণ দিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট বিক্রি হয়েছে ২২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে কার্তিয়ে, ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আরপেলস, বুকেলাতি ও ভেরনিয়েরসহ তাদের গহনা ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি হয়েছে ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কার্তিয়ে ও ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আরপেলসের মতো ব্র্যান্ডগুলো আগামী বছরগুলোয় গড় বিলাসপণ্য বাজারের তুলনায় বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাই জুয়েলারির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি মূল্য। ফ্যাশন পণ্যের তুলনায় গহনা অনেক বেশি স্থায়ী ও মূল্য সংরক্ষণে সক্ষম বলে মনে করেন ক্রেতারা।

এইচএসবিসির তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের পর থেকে বিভিন্ন বিলাসপণ্যের দাম গড়ে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে গহনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম নেতিবাচক ছিল।

বিশেষ করে স্বর্ণ ও মূল্যবান পাথরের অন্তর্নিহিত মূল্য গহনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। বিলাসবহুল ব্যাগ বা ফ্যাশন সামগ্রীর দামের সঙ্গে তুলনা করলে এখন অনেক ক্রেতা গহনাকে বেশি যুক্তিসংগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।

ইতালির বিলাসবহুল গহনা প্রতিষ্ঠান বুকেলাতির প্রধান নির্বাহী নিকোলাস লুকসিঙ্গার বলেন, ‘স্বর্ণের দাম বাড়ার খবর গণমাধ্যমে বেশি আসায় গ্রাহকরা আরো বেশি উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে গহনা কেবল অলংকার নয়, এটি একটি বিনিয়োগও।’

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিলাসপণ্যের অন্যতম বড় বাজার হিসেবে বিবেচিত। বিশ্লেষকদের মতে, সেখানে শেয়ারবাজারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিলাসপণ্যের বাজারে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের গহনার বিক্রি বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

এদিকে গহনা নির্মাতারা এখন কেবল মূল্যবান পাথর বা ধাতুর ওপর নির্ভর করছেন না। তারা ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে নতুন সংগ্রহ তৈরি করছেন। উদাহরণ হিসেবে ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আরপেলস এ বছর মিসরীয় সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রায় ১৮০টি গহনার একটি বিশেষ সংগ্রহ উন্মোচন করেছে। এতে তাদের দীর্ঘদিনের পেটেন্টকৃত ‘মিস্ট্রি সেট’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা তৈরি করতে বিশেষ দক্ষতা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ক্যাথরিন রেনিয়ের জানান, হাই জুয়েলারি তাদের ব্র্যান্ডের সৃজনশীলতা ও কারিগরি দক্ষতার মূল ভিত্তি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এ দক্ষতা স্থানান্তরের মাধ্যমেই তারা তাদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। —খবর ও ছবি এফটি

আরও